Written by 8:00 pm Disease & Fungi, Fruits, Gardening

Mango diseases: আম গাছের রোগ ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের সহজ উপায়

Mango diseases

আম বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও অর্থকরী ফল। “ফলের রাজা” হিসেবে পরিচিত এই ফল চাষে কৃষকদের অন্যতম বড় সমস্যা হলো বিভিন্ন রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ (Mango diseases)। সময়মতো রোগ শনাক্ত করতে না পারলে ফলন অনেক কমে যেতে পারে, এমনকি গাছও মারা যেতে পারে। আমগাছে ছত্রাকজনিত, ব্যাকটেরিয়াজনিত ও পোকামাকড়জনিত নানা ধরনের রোগ দেখা যায়। এই নিবন্ধে আমগাছের বিভিন্ন রোগ, তাদের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, যা কৃষক ও বাগান মালিকদের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

আমগাছের বিভিন্ন রোগের লক্ষণ ভিন্ন হলেও কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখে সহজেই রোগ শনাক্ত করা যায়। 

  • আমি গাছের পাতায় বাদামি বা কালো দাগ, পাতা কুঁকড়ে যাওয়া, কিনারা শুকিয়ে যাওয়া এবং অকালে পাতা ঝরে পড়া ছত্রাকজনিত রোগের সাধারণ লক্ষণ। আর পাতার ওপর সাদা গুঁড়ার মতো আস্তরণ দেখা গেলে তা পাউডারি মিলডিউর লক্ষণ।
  • মুকুল কালো হয়ে যাওয়া, ফুল ঝরে পড়া, মুকুল বিকৃত হওয়া এবং ফুল থেকে ফল না হওয়া রোগের লক্ষণ। 
  • ফলে কালো বা বাদামি দাগ, ফল পচে যাওয়া, ফলের বোঁটা কালচে হয়ে যাওয়া এবং কাঁচা অবস্থায় ফল ঝরে পড়া অ্যানথ্রাকনোজসহ বিভিন্ন ফলের রোগের লক্ষণ। 
  • ডালপালা শুকিয়ে যাওয়া, কাণ্ড থেকে আঠালো কষ বের হওয়া, ছাল ফেটে যাওয়া এবং গাছের বৃদ্ধি কমে যাওয়া কাণ্ডজনিত রোগের লক্ষণ। 

সময়মতো এসব লক্ষণ শনাক্ত করতে পারলে দ্রুত প্রতিকার নেওয়া যায় এবং ফলনের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব (Mango diseases)। 

আমগাছে সাধারণত ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসজনিত বিভিন্ন রোগ দেখা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রোগ হলো— 

  • অ্যানথ্রাকনোজ (Anthracnose):  Colletotrichum gloeosporioides ছত্রাকের কারণে আম গাছে এই রোগ হয়। বর্ষাকালে আর্দ্র আবহাওয়ায় এর প্রকোপ বেশি দেখা যায়। এটি মূলত পাতা, মুকুল, ফুল ও ফলে আক্রমণ করে।
  • পাউডারি মিলডিউ:  এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ, যা মূলত মুকুল ও কচি পাতায় আক্রমণ করে এবং ফলন কমিয়ে দেয়। 
  • ম্যাঙ্গো ম্যালফরমেশন (Mango Malformation):  এটি একটি জটিল রোগ, যাতে আম গাছের কুঁড়িগুলো বিকৃত হয়ে যায় এবং স্বাভাবিকভাবে ফুল ফোটে না।
  • ডাই-ব্যাক:  এই রোগের ফলে গাছের ডালপালা ওপর থেকে নিচের দিকে শুকিয়ে যেতে থাকে ও মরেও যেতে পারে।
  • গামোসিস বা কষ ঝরা রোগ:  এই রোগে গাছের কাণ্ড ও ডাল থেকে আঠালো কষ বের হয়। 
  • ব্যাকটেরিয়াল ব্ল্যাক স্পট:  ব্যাকটেরিয়ার কারণে এ রোগ হয়, যেখানে পাতা ও ফলে কালো বা কালচে দাগ দেখা যায়। 

পাউডারি মিলডিউ আমগাছের একটি সাধারণ ও মারাত্মক ছত্রাকজনিত রোগ, যা Oidium mangiferae ছত্রাকের কারণে হয়। এই রোগ সাধারণত শুষ্ক ও ঠান্ডা আবহাওয়ায়, বিশেষ করে মুকুল আসার সময় বেশি দেখা যায় (Powdery mildew)

  • রোগের কারণ:  কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল, শুষ্ক আবহাওয়া, রাতের কম তাপমাত্রা, উচ্চ আর্দ্রতা এবং ঘন বাগান এই রোগের বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
  • লক্ষণ:  আক্রান্ত মুকুল, কচি পাতা ও ফলের গায়ে সাদা গুঁড়ার মতো আস্তরণ দেখা যায়। মুকুল কালো হয়ে শুকিয়ে যায়, ফুল ঝরে পড়ে, পাতা কুঁকড়ে যায় এবং কাঁচা ফল ঝরে যেতে পারে।
  • ক্ষতির মাত্রা:  সময়মতো এই রোগ নিয়ন্ত্রণ না করলে এই রোগে ৫০–৭০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন কমে যেতে পারে। মুকুল আসার সময় এর ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়।
  • প্রতিরোধ ব্যবস্থা:  নিয়মিত বাগান পর্যবেক্ষণ, সঠিক দূরত্বে গাছ লাগিয়ে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা এবং মুকুল আসার শুরুতেই ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করলে এই রোগের প্রকোপ কমানো যায়।

রোগের পাশাপাশি বিভিন্ন পোকামাকড়ও আমগাছের বড় ধরনের ক্ষতি করে। প্রধান ক্ষতিকর পোকাগুলো হলো (Mango tree)— 

  • আমের হপার বা শোষক পোকা (Mango Hopper):  এটি মুকুল ও কচি পাতার রস শুষে খায়। ফলে মুকুল শুকিয়ে যায়, ফলন কমে যায় এবং এর নিঃসৃত মধুরসে পরে শুটি মোল্ড রোগ দেখা দেয়।
  • ফলের মাছি (Fruit Fly):  এই পোকা আধাপাকা ও পাকা ফলে ডিম পাড়ে। ডিম থেকে বের হওয়া লার্ভা ফলের ভেতরের অংশ খেয়ে ফেলে, ফলে ফল পচে যায়।
  • মিলিবাগ (Mealybug):  এটি কাণ্ড, ডাল ও পাতার রস শুষে গাছকে দুর্বল করে এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে।
  • স্টেম বোরার (Stem Borer):  এর লার্ভা কাণ্ড ও ডালের ভেতরে সুড়ঙ্গ তৈরি করে। এতে ডাল দুর্বল হয়ে ভেঙে যেতে পারে, এমনকি গাছও মারা যেতে পারে।
  • পাতা মোড়ানো পোকা (Leaf Webber):  এই পোকা পাতা মুড়িয়ে জাল তৈরি করে ভেতর থেকে পাতা খায়, ফলে গাছের সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত হয়।

এই পোকামাকড়গুলো শুধু সরাসরি ক্ষতি করে না, অনেক সময় বিভিন্ন ছত্রাকজনিত ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ ছড়াতেও সহায়তা করে। তাই রোগ ও পোকা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM) অনুসরণ করা প্রয়োজন (Mango diseases)।

          রোগের নাম                 প্রতিকারের উপায় 
১.পাতা মোড়ানো পোকা আম গাছে ম্যালাথিয়ন স্প্রে এবং আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে ধ্বংস করুন।
২. স্টেম বোরার সুড়ঙ্গে তার ঢুকিয়ে লার্ভাগুলো বের করে আনা এবং কেরোসিন বা কীটনাশক প্রবেশ করান।
৩.মিলিবাগ গাছের কাণ্ডের চারপাশে ক্লোরপাইরিফস স্প্রে করুন এবং আঠালো ব্যান্ড লাগিয়ে দিন।
৪.ফলের মাছি ফেরোমন ফাঁদ পাতুন এবং পোকামাকড় ধরা পড়া ঝরে পরা ফলগুলো মাটির নিচে পুঁতে দিন।
৫.হপার পোকা কুঁড়ি ফোটার সময় ইমিডাক্লোপ্রিড বা থায়ামেথোক্সামের মতো কীটনাশক স্প্রে করুন।
৬.ব্যাকটেরিয়াল ব্ল্যাক স্পট           স্ট্রেপ্টোসাইক্লিন মিশ্রিত কপার অক্সিক্লোরাইড স্প্রে করুন।                    
৭.গামোসিস কাণ্ডের আক্রান্ত অংশটি পরিষ্কার করে বোর্দো পেস্ট লাগান।
৮. ম্যাঙ্গো ম্যালফরমেশন  বিকৃত কুঁড়িগুলো কেটে ফেলুন এবং ন্যাফথালিন অ্যাসিটিক অ্যাসিড প্রয়োগ করুন।
৯.পাউডারি মিলডিউ কুঁড়ি ফোটার সময় সালফার বা হেক্সাকোনাজোলের মতো ছত্রাকনাশক স্প্রে করুন; গাছগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত দূরত্ব রাখুন।
১০.ডাই-ব্যাক গাছের আক্রান্ত ডালপালাগুলো কেটে ফেলুন এবং কপার অক্সিক্লোরাইড পেস্ট ব্যবহার করুন।
১১.অ্যানথ্রাকনোজ প্রতি ১৫ দিন অন্তর কারবেন্ডাজিম বা ম্যানকোজেবের মতো ছত্রাকনাশক স্প্রে করুন; আক্রান্ত ডালপালা ছেঁটে ফেলুন।

আমগাছের সুস্থ বৃদ্ধি ও ভালো ফলনের জন্য রোগ ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অ্যানথ্রাকনোজ, পাউডারি মিলডিউ, ডাই-ব্যাকসহ বিভিন্ন রোগ এবং ক্ষতিকর পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে গাছকে রক্ষা করতে নিয়মিত পরিচর্যা করা প্রয়োজন। সময়মতো ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক প্রয়োগ, গাছের সঠিক পরিচর্যা এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM) অনুসরণ করলে আমগাছকে সুস্থ রাখা এবং ভালো ফলন নিশ্চিত করা সম্ভব। এসব নিয়ম মেনে চললে একজন আমচাষী দীর্ঘমেয়াদে অধিক লাভবান হতে পারবেন (Mango diseases)।

প্রশ্ন ১. আম গাছের রোগ নিরাময়ের উপায় কি  (How to treat mango tree diseases)?

উত্তর ১: রোগাক্রান্ত ডাল, পাতা ও ফল কেটে পরিষ্কার করুন এবং বাগান পরিষ্কার রাখুন। প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শে উপযুক্ত ছত্রাকনাশক বা কীটনাশক ব্যবহার করুন।

প্রশ্ন ২. আমের ম্যালফরমেশন রোগ কী?

উত্তর ২: আমের ম্যালফরমেশন এমন একটি রোগ, যাতে মুকুল ও ফুল বিকৃত হয়ে যায় এবং স্বাভাবিকভাবে ফল ধরে না। এর ফলে ফলন অনেক কমে যায়। 

প্রশ্ন ৩. আমের পোকা খেলে কি হয় (Mango diseases and control)? 

উত্তর ৩: পোকা আক্রান্ত আম খেলে সাধারণত গুরুতর সমস্যা হয় না, তবে পেটের অস্বস্তি বা সংক্রমণের ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই পোকা ধরা বা পচা আম না খাওয়াই ভালো। 

প্রশ্ন ৪. আম পাতার ওয়েবার রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ কি? 

উত্তর ৪: পাতা ওয়েবার দমনে আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে নষ্ট করুন এবং প্রয়োজনে কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত কীটনাশক স্প্রে করুন। এতে পোকার আক্রমণ কমে যায়। 

Visited 1 times, 1 visit(s) today
Close